
মোঃ মনিরুজ্জামান চৌধুরী
নড়াইল প্রতিনিধি :
বাংলা লোকসংগীতের কিংবদন্তি চারণ কবি বিজয় সরকার–এর জন্মভিটা আজ অযত্ন ও অবহেলায় ধ্বংসের মুখে। নড়াইল সদর উপজেলার প্রত্যন্ত ডুমদি গ্রামে অবস্থিত এই ঐতিহাসিক বসতভিটা যথাযথ সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে দিন দিন জরাজীর্ণ হয়ে পড়ছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত দর্শনার্থীরা সেখানে গিয়ে হতাশা প্রকাশ করছেন।
“তুমি জানো না রে প্রিয়”, “আমার পোষা পাখি উড়ে যাবে সজনী”, “এ পৃথিবী যেমন আছে তেমনই ঠিক রবে”—এমন অসংখ্য কালজয়ী গানের স্রষ্টা বিজয় সরকার ১৯০৩ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি নড়াইলের ডুমদি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর প্রকৃত নাম ছিল বিজয় অধিকারী। সংগীত ও লোকসাহিত্যে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি “সরকার” উপাধিতে ভূষিত হন। তিনি একাধারে গীতিকার, সুরকার ও শিল্পী ছিলেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মুক্তিযুদ্ধসহ বিভিন্ন সামাজিক ও মানবিক বিষয় নিয়ে প্রায় ১ হাজার ৮০০ গান রচনা করেন এই কিংবদন্তি শিল্পী। ১৯৮৫ সালে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে তাঁর মৃত্যু হয়। পরবর্তীতে ২০১৩ সালে শিল্পকলায় বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে মরণোত্তর একুশে পদকে ভূষিত করা হয়।
সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা গেছে, ডুমদির বিলের মাঝখানে অবস্থিত কবিয়ালের বসতভিটার চারপাশে কোনো সীমানাপ্রাচীর নেই। অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে আছে পুরো এলাকা। উত্তর পাশে থাকা দুই কক্ষবিশিষ্ট ছোট ঘরটির দরজা-জানালা উইপোকায় আক্রান্ত। একটি কক্ষে ধান সংরক্ষণ করা হয়েছে, অন্য কক্ষে পড়ে আছে পুরোনো খাট ও বাক্স—যা অযত্নে নষ্ট হচ্ছে।
ঘরের সামনে একটি ছোট মন্দিরে ভক্তরা নিয়মিত পূজা-অর্চনা করেন। দক্ষিণ পাশে “বিজয় সংসদ” নামে একটি ছোট কার্যালয় ও আধাপাকা দোচালা ঘর থাকলেও সেগুলোর অবস্থাও খুব একটা ভালো নয়।
স্থানীয় শিল্পী ও সংস্কৃতিপ্রেমীরা অভিযোগ করে বলেন, বিজয় সরকারের গান সংরক্ষণ ও প্রচারের জন্য কার্যকর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ নেই। লোকসংস্কৃতির এই মহান শিল্পীকে নিয়ে গবেষণা, তাঁর গান সংরক্ষণ এবং নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে সরকারের আরও বড় ভূমিকা রাখা প্রয়োজন।
লোকসংগীত শিল্পী প্রতুল হাজরা বলেন, “বাংলাদেশের লোকসংস্কৃতির অন্যতম ধারক-বাহক ছিলেন বিজয় সরকার। অথচ তাঁর স্মৃতি সংরক্ষণে আমরা এখনো যথেষ্ট উদ্যোগ নিতে পারিনি।”
সিনিয়র সাংবাদিক সুলতান মাহমুদ বলেন, “বিজয় সরকারের চেতনা ও সংগীত নিয়ে গবেষণা হওয়া উচিত। তরুণ প্রজন্মের কাছে তাঁকে পৌঁছে দিতে রাষ্ট্রীয়ভাবে আরও উদ্যোগ প্রয়োজন।”
দর্শনার্থীরা জানান, কবিয়ালের বাড়িতে বসার ব্যবস্থা নেই, নেই নিরাপদ যাতায়াত বা বিশুদ্ধ পানির সুবিধাও। বিশেষ করে বাড়িতে যাওয়ার একমাত্র সড়কটি দীর্ঘদিন ধরে বেহাল অবস্থায় পড়ে আছে। বর্ষা মৌসুমে সড়কটি পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় চরম দুর্ভোগে পড়তে হয় স্থানীয় বাসিন্দা ও দর্শনার্থীদের।
দর্শনার্থী শুভ সরকার ও কৃপাচার্য বিশ্বাস বলেন, “বিজয় সরকারের বসতভিটা সংরক্ষণে দ্রুত সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ, একজন তত্ত্বাবধায়ক নিয়োগ এবং একটি স্মৃতি সংগ্রহশালা প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।”এ বিষয়ে নড়াইলের জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ আবদুল ছালাম বলেন, “বিজয় সরকারের বাড়ির পুরোনো ঘর সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বাড়ির চারপাশে সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে। তাঁর স্মৃতি সংরক্ষণে জেলা প্রশাসন কাজ করছে।”সংস্কৃতিপ্রেমীদের মতে, যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করা না হলে বাংলা লোকসংস্কৃতির এই উজ্জ্বল নক্ষত্রের স্মৃতিচিহ্ন একদিন হারিয়ে যাবে।















