
পাইকগাছা (খুলনা) প্রতিনিধি
খুলনার পাইকগাছায় ৩৬ নং ফতেপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির (এসএমসি) নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার দীর্ঘ ১০ দিন পর এক নারী অভিভাবকের স্ববিরোধী অবস্থানকে কেন্দ্র করে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার এবং নিজে রেজুলেশন বইয়ে স্বাক্ষর করার ১০ দিন পর সুবর্ণা আক্তার প্রিয়া নামের এক অভিভাবকের এই আকস্মিক পুনঃনির্বাচনের দাবি নিয়ে স্থানীয়দের মাঝে নানা প্রশ্ন উঠেছে।
বিষয়টি খতিয়ে দেখতে গত ২৭ জুন (শনিবার) বিদ্যালয়টিতে সরেজমিনে তদন্তে যান উপজেলা সহকারী শিক্ষা অফিসাররা।স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ৯ জুন নিয়ম অনুযায়ী তফসিল ঘোষণা ও মাইকিং করে সংশ্লিষ্ট সকলকে অবহিত করার পর প্রত্যক্ষ ভোটের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির নির্বাচন সম্পন্ন হয়।নবনির্বাচিত কমিটিতে মতিয়ার রহমান ও মুসলিমা খাতুন বিদ্যুৎসাহী সদস্য; মুজিবুর রহমান সরদার ও ফিরোজুল ইসলাম পুরুষ অভিভাবক সদস্য এবং হাবিবা খাতুন ও রত্না খাতুন মহিলা অভিভাবক সদস্য নির্বাচিত হন।
কমিটি গঠনের সমস্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার ১০ দিন পর স্থানীয় জলিল সরদারের মেয়ে সুবর্ণা আক্তার প্রিয়াসহ কয়েকজন অভিভাবক নির্বাচন প্রক্রিয়া ও বিধিমালা লঙ্ঘনের দাবি তুলে এই কমিটি বাতিলের আবেদন জানান।তবে সরেজমিনে জানা যায়, প্রিয়ার এই দাবির পেছনে বড় ধরনের আইনি ও নৈতিক অসংগতি রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী রেজুলেশন বইয়ে স্বাক্ষর করার অর্থ হলো পুরো প্রক্রিয়ার সাথে সম্পূর্ণ একমত হওয়া। নির্বাচনকালীন সময়ে কোনো ধরনের লিখিত বা মৌখিক আপত্তি না জানিয়ে, ১০ দিন পর করা এই অভিযোগকে স্থানীয় সচেতন মহল ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে মনে করছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযোগকারী সুবর্ণা আক্তার প্রিয়া নিজের স্ববিরোধী অবস্থানের কথা স্বীকার করে বলেন,”ওই দিন আমি উপস্থিত ছিলাম এবং স্বাক্ষরও করেছিলাম। কিন্তু তখন বিষয়টি বুঝতে পারিনি, তাই পরে অভিযোগ করেছি।”তবে সচেতন অভিভাবকদের প্রশ্ন—একজন প্রাপ্তবয়স্ক ও সচেতন নাগরিক হিসেবে উপস্থিত থেকে স্বাক্ষর করার পর “বুঝতে পারিনি” এমন দাবি কতটা যৌক্তিক ও আইনসংগত?
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শেখ বাদশা আলমগীর বলেন,”গঠনতান্ত্রিকভাবে সকল অভিভাবক ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে প্রত্যক্ষ ভোটে বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি গঠনের দিন অভিযোগকারী সুবর্ণা আক্তার প্রিয়া নিজে উপস্থিত থেকে হাসিমুখে রেজুলেশন বইয়ে স্বাক্ষর করেছিলেন। ১০ দিন পর কেন এই ডিগবাজি, তা সবার কাছে পরিষ্কার।”
তিনি অভিযোগকারীর উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলে আরও বলেন,”মূলত কয়েকজন সরল-সোজা অভিভাবককে আমার (প্রধান শিক্ষক) নাম ভাঙিয়ে, ভুল বুঝিয়ে কাগজে স্বাক্ষর নিয়ে এই ভিত্তিহীন অভিযোগটি দাঁড় করানো হয়েছে, যা এক ধরনের প্রতারণা।”অভিযোগ পাওয়ার পর পরই বিষয়টি আমলে নিয়েছে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের জন্য দায়িত্ব পেয়ে উপজেলা সহকারী শিক্ষা অফিসার শচিন্দ্র নাথ ও ভূধর চন্দ্র সানা গত ২৭ জুন (শনিবার) সরেজমিনে বিদ্যালয়টি পরিদর্শনে যান। তারা প্রধান শিক্ষক, নবনির্বাচিত কমিটির সদস্য ও স্থানীয় অভিভাবকদের সাক্ষ্য গ্রহণ করেন।
তবে তদন্তের সময় স্কুলের শিক্ষক, কর্মচারী ও এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের সামনেই অভিযোগকারী সুবর্ণা আক্তার প্রিয়া ও তার বোন শিক্ষা অফিসারদের সাথে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন বলে অভিযোগ উঠেছে।এ বিষয়ে উপজেলা সহকারী শিক্ষা অফিসার শচিন্দ্র নাথ বলেন,”লিখিত অভিযোগের প্রেক্ষিতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনায় আমরা বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করেছি। স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ও অভিভাবকদের উপস্থিতিতে তদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। দ্রুতই বিস্তারিত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।”
উপজেলা ভারপ্রাপ্ত প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার সঞ্জয় কুমার দেবনাথ জানান,”সহকারী শিক্ষা অফিসারদের তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পরই পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”
আইনি নথিতে স্বাক্ষর করার পর প্রিয়ার এই “বুঝতে না পারার” অজুহাত শিক্ষা প্রশাসনের তদন্তে কতটুকু টিকবে, এখন সেটাই দেখার বিষয়। এলাকার সাধারণ মানুষ ও ভোটাররা এখন তদন্ত প্রতিবেদনের চূড়ান্ত ফলাফলের দিকে তাকিয়ে আছেন।















