
এস,এম,আলাউদ্দিন সোহাগ,পাইকগাছা (খুলনা)
উন্নয়নের জোয়ার আর অবকাঠামোগত অগ্রগতির বড় বড় দাবির মাঝেই ভাঙা টিনের ছাউনি যেন আকাশের সঙ্গে লড়াই করছে, ফাটল ধরা দেয়াল যেন প্রতিটি ঝড়ে কেঁপে উঠছে মৃত্যুর ইশারায়। আর সেই ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের নিচেই প্রতিদিন বসে ৬১ জন শিশুসহ ৫ জন শিক্ষক —যাদের মাথার ওপর নিরাপদ ছাদের বদলে ঝুলে আছে অনিশ্চিত বিপদের ছায়া। এ যেন শিক্ষা নয়, প্রতিদিনের এক নীরব যুদ্ধ। উন্নয়নের দাবি আর বাস্তবতার নির্মম বৈপরীত্য দেখা যায় পাইকগাছা উপজেলার সোলাদানা ইউনিয়নর ৮৮নং টেংরামারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে।
বিদ্যালয়ে প্রতিদিন কোমলমতি শিক্ষার্থীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পাঠদান করছে একটি জরাজীর্ণ ও ভাঙাচোরা টিনশেড ভবনের নিচে। কোথাও ছাউনি ফেটে পানি ঝরছে, কোথাও টিন খুলে পড়ে যাওয়ার উপক্রম—আবার কোথাও বাঁশের খুঁটি দিয়ে কোনো রকমে ঠেকিয়ে রাখা হয়েছে পুরো কাঠামো। সামান্য বৃষ্টি হলেই শ্রেণিকক্ষ পরিণত হয় পানির নিচে ডুবে থাকা এক অনিরাপদ স্থানে, বই-খাতা ভিজে যায়, আর থমকে দাঁড়ায় শিক্ষা কার্যক্রম। এমন ভয়াবহ ঝুঁকির মধ্যেও চলছে পাঠদান, অথচ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃশ্যমান কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেই—যেন একটি অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনার অপেক্ষায় দিন গুনছে পুরো প্রতিষ্ঠানটি।
সরেজমিনে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের টিন ও অ্যাসবেস্টস নির্মিত ভবনের ছাউনি বিভিন্ন স্থানে ভেঙে ও ফেটে গেছে। কোথাও বড় ফাটল, কোথাও টিন খুলে পড়ার উপক্রম হয়েছে। অস্থায়ীভাবে বাঁশের খুঁটি দিয়ে ছাউনিটি ঠেকিয়ে রাখা হয়েছে, যা যেকোনো সময় বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। ভবনের দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়ছে এবং ইটের গাঁথুনি দুর্বল হয়ে পড়েছে। বারান্দার অবস্থাও অত্যন্ত নাজুক।
বিদ্যালয়টি ১৯৭৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে জাতীয়করণ করা হয়। কিন্তু জাতীয়করণের দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও অবকাঠামোগত উন্নয়নের তেমন কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
স্থানীয় এক অভিভাবক বলেন,“আমাদের সন্তানদের এমন ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে পাঠাতে ভয় লাগে। যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। দ্রুত নতুন ভবন নির্মাণ করা জরুরি।”
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক অধির কৃষ্ণ মন্ডল এ প্রতিবেদককে জানান—“বিদ্যালয় ভবনটি দীর্ঘদিন ধরে জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ঝড়ে ছাদের টিনের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বৃষ্টি হলেই শ্রেণিকক্ষে পানি পড়ে এবং পাঠদান ব্যাহত হয়। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে আমরা বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। দ্রুত সংস্কার বা নতুন ভবন নির্মাণ হলে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা স্বস্তির সঙ্গে পাঠদান কার্যক্রম চালাতে পারবে।”
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) সঞ্জয় দেবনাথ বলেন,“বিদ্যালয় ভবনের বিষয়টি আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যকে অবহিত করেছি। খোলা জায়গায় অবস্থিত হওয়ায় প্রবল বাতাসে টিনের কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আপাতত দ্রুত মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বিদ্যালয়টির জন্য নতুন ভবন নির্মাণের বিষয়টি প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। বাজেট বরাদ্দ পাওয়া গেলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ শুরু করা হবে।”
এলাকাবাসীর দাবি, আর বিলম্ব নয়—বিদ্যালয়টির জরাজীর্ণ ভবন দ্রুত সংস্কার বা নতুন পাকা ভবন নির্মাণে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া হোক। কারণ উন্নয়নের প্রকৃত চিত্র তখনই ফুটে উঠবে, যখন গ্রামের শিশুরাও নিরাপদ ছাদের নিচে নিশ্চিন্তে লেখাপড়ার সুযোগ পাবে।















