
আলাউদ্দিন সোহাগ,পাইকগাছা ( খুলনা )
দেশের জ্বালানি খাতে গতিশীলতা আনয়ন এবং আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রাখতে জ্বালানি তেলের নতুন মূল্য কাঠামো কার্যকর করেছে সরকার। গতকাল ১৮ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে জারিকৃত এক বিশেষ গেজেট বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই নতুন দর ঘোষণা করা হয়। ১৯ এপ্রিল থেকে সারাদেশে এই দাম কার্যকর হয়েছে।
২০২০ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত জ্বালানি তেলের মূল্যের এই ছয় বছরের পরিক্রমা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সরকার মূলত উন্নয়নমুখী অর্থনীতি বজায় রাখা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের অভিঘাত থেকে দেশকে সুরক্ষিত রাখার একটি ভারসাম্যপূর্ণ নীতি গ্রহণ করেছে। নতুন মূল্য কাঠামো ও সরকারি যুক্তি সর্বশেষ প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ভোক্তা পর্যায়ে প্রতি লিটার ডিজেল ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১৩০ টাকা, পেট্রোল ১৩৫ টাকা এবং অকটেন ১৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সরকারের উচ্চপর্যায়ের সূত্রমতে, এই মূল্য নির্ধারণে কেবল মুনাফা নয়, বরং আমদানি ব্যয় ও সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে একটি ‘গোল্ডেন ব্যালেন্স’ খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে।
গেজেটে দেখা যায়, প্রতি লিটার ডিজেলে এক্স-রিফাইনারি মূল্য ১০৪.৭০ টাকা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অত্যন্ত সামান্য মার্জিন এবং পরিবহন ব্যয়। বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের বিনিময় হার এবং অপরিশোধিত তেলের দামের অস্থিরতা বিবেচনা করলে এই মূল্যবৃদ্ধি আসলে একটি বাস্তবমুখী সমন্বয়। ২০২০-২৬ সংকট মোকাবিলায় কৌশলগত বিবর্তন গত ছয় বছরে জ্বালানি তেলের বাজার কয়েক দফায় বড় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে, যার প্রতিটি ধাপেই সরকারের নির্দিষ্ট কৌশল লক্ষ্য করা গেছে।
স্থিতিশীলতার পর্যায় (২০২০) দীর্ঘ সময় ডিজেল ৬৫ ও অকটেন ৮৯ টাকায় স্থির রেখে সরকার করোনাকালীন অর্থনীতিকে সচল রাখতে বড় অঙ্কের ভর্তুকি প্রদান করেছে।সমন্বয়ের শুরু (২০২১-২২)বিশ্বজুড়ে ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত হলে সরকার বাধ্য হয়ে বড় সমন্বয়ে যায়। তবে সে সময়ও সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী বজায় রাখতে কৃষি ও পরিবহন খাতে বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছিল।
স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি ও ২০২৬-এর গেজেট ২০২৪-২৫ সাল থেকে সরকার “অটোমেটিক প্রাইসিং ফর্মুলা” বা স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতির দিকে যাত্রা শুরু করে। সর্বশেষ ২০২৬ সালের গেজেটটি সেই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতারই একটি অংশ।
তুলনামূলক বাজার বিশ্লেষণ সময়কাল | ডিজেল (টাকা) | অকটেন (টাকা) | প্রেক্ষাপট |২০২০ | ৬৫ | ৮৯ | করোনাকালীন প্রণোদনা ও সরকারি ভর্তুকি। |২০২২ | ১১৪ | ১৩৫ | বৈশ্বিক যুদ্ধ ও ডলার সংকট মোকাবিলা। |২০২৬ (বর্তমান) | ১১৫ | ১৪০ | আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে যৌক্তিক সমন্বয়। |ব্যালেন্সড ইকোনমি: উন্নয়ন বনাম বাস্তবতাঅর্থনীতিবিদদের মতে, জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে পরিবহন ও কৃষি খাতে প্রভাব পড়া স্বাভাবিক। তবে এর একটি ইতিবাচক দিকও রয়েছে। জ্বালানি খাতে ভর্তুকির চাপ কমলে সরকার সেই অর্থ শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বড় অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যয় করতে পারে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞগণ মনে করছেন, ২০২৬ সালের এই নতুন গেজেট মূলত বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনকে (বিপিসি) আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করার একটি পদক্ষেপ। এতে ভবিষ্যতে জ্বালানি আমদানিতে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমবে এবং নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত হবে।কৃষি ও সাধারণের সুরক্ষায় সরকারি কৌশল
সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় সূত্র ও সরকারি নীতিমালার তথ্য অনুযায়ী, তেলের মূল্য সমন্বয়ের ফলে সাধারণ মানুষের ওপর যাতে বাড়তি চাপ না পড়ে, সেজন্য সরকার বহুমুখী পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষের সুরক্ষায় খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি এবং টিসিবির মাধ্যমে সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য সরবরাহ কার্যক্রম আরও জোরদার করার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
পাশাপাশি কৃষি খাতের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সেচ কাজে তেলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর একটি দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। সৌরচালিত সেচ পাম্প স্থাপন এবং কৃষি যান্ত্রিকীকরণে ভর্তুকি প্রদানের মাধ্যমে উৎপাদন খরচ কমিয়ে আনার বিষয়েও গুরুত্ব দিচ্ছে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো। সরকারের এই কৌশল মূলত জ্বালানি তেলের দামের প্রভাব থেকে দেশের খাদ্য উৎপাদন ও সাধারণ ভোক্তাকে নিরাপদ রাখার একটি প্রচেষ্টা।
২০২০ থেকে ২০২৬ সাল—এই ছয় বছরে জ্বালানি তেলের মূল্য কাঠামো মূলত বিশ্ব অর্থনীতির এক অস্থির সময়ের প্রতিচ্ছবি। তবে সরকারের পক্ষ থেকে বারবার আশ্বস্ত করা হয়েছে যে, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমলে দেশের বাজারেও তার সুফল গ্রাহক পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া হবে। এই ভারসাম্যপূর্ণ নীতিই আগামীতে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে বলে আশা করা হচ্ছে।













