সর্বশেষ:

শৈত্যপ্রবাহের থাবায় স্থবির জনজীবন, খুলনার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে কনকনে শীত—পাইকগাছা-কয়রায় তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রিতে নেমে ১১–১২ ডিগ্রিতে দোলাচল

Facebook
Twitter
LinkedIn

এস,এম,আলাউদ্দিন সোহাগ , পাইকগাছা, খুলনা

চলমান শৈত্যপ্রবাহে খুলনা বিভাগের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জনজীবন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। উপকূলঘেঁষা খুলনার পাইকগাছা ও কয়রা উপজেলাসহ ডুমুরিয়া, বটিয়াঘাটা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটের বিভিন্ন এলাকায় গত কয়েকদিন ধরে তীব্র শীত অনুভূত হচ্ছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এসব এলাকায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা নেমে এসেছে প্রায় ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে, আবার দিনের বিভিন্ন সময়ে তা ১১ থেকে ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করছে। আকাশ ঘন মেঘে ঢাকা থাকায় দিনের বেলাতেও সূর্যের দেখা মিলছে না, ফলে শীতের অনুভূতি স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি।

ভোর রাত থেকেই ঘন কুয়াশা ও হিমেল হাওয়ায় পুরো অঞ্চল আচ্ছন্ন হয়ে পড়ছে। সকাল গড়িয়ে দুপুর হলেও অনেক স্থানে আলো-আঁধারি পরিবেশ বিরাজ করছে। এর ফলে সড়ক ও নৌপথে যান চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। মহাসড়ক, গ্রামীণ সড়ক ও নদীপথে চলাচলকারী যানবাহনগুলোকে ধীরগতিতে চলতে হচ্ছে। কুয়াশার কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বেড়েছে। শীত ও কুয়াশার প্রভাবে স্কুলগামী শিক্ষার্থী, অফিসগামী মানুষ ও জরুরি কাজে বের হওয়া সাধারণ মানুষকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

শীতের প্রভাব পড়েছে কর্মজীবন ও শিক্ষাক্ষেত্রেও। অনেক শিক্ষার্থী তীব্র শীতের কারণে নিয়মিত বিদ্যালয়ে যেতে পারছে না। দিনমজুর, কৃষিশ্রমিক ও জেলেরা ভোরের ঠান্ডা এড়াতে কাজে যেতে দেরি করছেন বা কাজ বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে করে আয়-রোজগারে টান পড়ছে এবং নিম্নআয়ের মানুষের জীবনযাত্রা আরও কষ্টসাধ্য হয়ে উঠছে।

পাইকগাছা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ইকরামুল হোসেন বলেন,কৃষি খাতে শৈত্যপ্রবাহের প্রভাব সবচেয়ে উদ্বেগজনক রূপ নিয়েছে। বোরো মৌসুমের শুরুতেই বীজতলা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষকরা।বোরো চারা স্থবির হয়ে পড়েছে। তরমুজের আবাদ করতে জমিতে জো হচ্ছে না। পাইকগাছা, কয়রা, ডুমুরিয়া ও বটিয়াঘাটা উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় ঘন কুয়াশা ও কম তাপমাত্রার কারণে বীজতলার চারা স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠছে না। অনেক বীজতলায় পাতায় হলদে ভাব দেখা দিয়েছে, আবার কোথাও কোথাও চারা পচে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কৃষকদের আশঙ্কা, তাপমাত্রা যদি আরও কয়েকদিন ১০ থেকে ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করে, তাহলে বোরো ধান উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। কৃষি বিভাগ থেকে বীজতলা ঢেকে রাখা, হালকা সেচ দেওয়া এবং প্রয়োজনে পলিথিন ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

শীতের তীব্রতায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন দরিদ্র, ছিন্নমূল ও ভাসমান মানুষ। পর্যাপ্ত গরম কাপড়ের অভাবে অনেককে খোলা আকাশের নিচে কিংবা অস্থায়ী আশ্রয়ে রাত কাটাতে হচ্ছে। হাট-বাজার, বাসস্ট্যান্ড ও রাস্তার পাশে আগুন জ্বালিয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা করছেন তারা। শীতের এই সময়ে সমাজের নিম্নআয়ের মানুষদের জন্য জীবন যেন এক কঠিন সংগ্রামে পরিণত হয়েছে।

স্বাস্থ্য খাতেও শীতের প্রভাব দিন দিন প্রকট হচ্ছে। শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ ব্যক্তিরা শীতজনিত রোগে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও স্থানীয় চিকিৎসালয়গুলোতে সর্দি, কাশি, জ্বর, শ্বাসকষ্ট ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। শিশু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক কওসার আলী গাজী জানিয়েছেন, তাপমাত্রা ১০ থেকে ১২ ডিগ্রির মধ্যে ওঠানামা করায় শীতের প্রকোপ আরও বেশি অনুভূত হচ্ছে। সবাইকে গরম কাপড় ব্যবহার, ঠান্ডা বাতাস এড়িয়ে চলা এবং শিশু ও বৃদ্ধদের প্রতি বিশেষ যত্ন নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।

স্থানীয় বাসিন্দা আবুল হাশেম জানান, দিনের পর দিন সূর্যের আলো না থাকায় ঘরবাড়ি স্যাঁতসেঁতে হয়ে পড়েছে। কাপড় শুকানো যাচ্ছে না, রান্নাবান্না ও দৈনন্দিন কাজকর্মেও বিঘ্ন ঘটছে। সন্ধ্যার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত শীতের তীব্রতা আরও বেড়ে যায়, যা অনেকের জন্য সহনীয় মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ওপর দিয়ে বর্তমানে মাঝারি থেকে তীব্র শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। এই অবস্থায় আরও দুই থেকে তিন দিন তাপমাত্রা ১০ থেকে ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করতে পারে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় শীতার্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে সরকার, প্রশাসন ও সমাজের বিত্তবানদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন সচেতন মহল।

Facebook
Twitter
LinkedIn

সর্বশেষ খবর

turan hossain rana