
মোঃ মনিরুজ্জামান চৌধুরী
নড়াইল প্রতিনিধি :
১৮৮৬ সালে প্রতিষ্ঠিত নড়াইল সরকারি ভিক্টোরিয়া কলেজ কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়—এটি নড়াইল অঞ্চলের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক অগ্রগতির এক দীর্ঘস্থায়ী সাক্ষী। ব্রিটিশ শাসনামল থেকে শুরু করে স্বাধীন বাংলাদেশ পর্যন্ত সময়ের নানা বাঁক পেরিয়ে কলেজটি আজও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উচ্চশিক্ষার অন্যতম ভরকেন্দ্র হিসেবে টিকে আছে।
নড়াইলের জমিদার রতন রায়ের হাতে ১৮৫৭ সালে প্রতিষ্ঠিত ভিক্টোরিয়া কলেজিয়েট উচ্চ বিদ্যালয়ের ধারাবাহিকতায় তার পুত্র চন্দ্র রায়ের উদ্যোগে কলেজটির যাত্রা শুরু হয়। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের রাণী ভিক্টোরিয়ার নামানুসারে নামকরণ করা হলেও প্রতিষ্ঠানটি ধীরে ধীরে স্থানীয় সমাজ ও জনমানুষের শিক্ষার চাহিদার সঙ্গে একাত্ম হয়ে ওঠে।
১৯৮০ সালের ১ মার্চ সরকারি মর্যাদা পাওয়ার পর কলেজটির শিক্ষা কার্যক্রমে গতি আসে। বর্তমানে উচ্চ মাধ্যমিক থেকে শুরু করে স্নাতক (অনার্স) ও স্নাতকোত্তর স্তর পর্যন্ত পাঠদান চালু রয়েছে। যশোর শিক্ষা বোর্ড ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্তির মাধ্যমে একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালিত হলেও স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে মানানসই শিক্ষার চর্চাই প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম শক্তি।
চিত্রা নদীর তীরে প্রায় ১৩.৮৫ একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত ক্যাম্পাসটি প্রাকৃতিকভাবে শিক্ষাবান্ধব। একাডেমিক ভবন, গ্রন্থাগার, বিজ্ঞান গবেষণাগার ও ছাত্রাবাস থাকলেও শিক্ষার্থী ও শিক্ষকসংখ্যার তুলনায় অবকাঠামোগত উন্নয়ন এখনও পর্যাপ্ত নয়—এমন মত দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষ করে আধুনিক গবেষণাগার, ডিজিটাল লাইব্রেরি ও তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থার ঘাটতি কলেজটির উচ্চশিক্ষা ও গবেষণামুখী অগ্রযাত্রাকে কিছুটা সীমিত করছে।
কলেজটির সবচেয়ে বড় শক্তি এর শিক্ষকসমাজ ও শিক্ষার্থীদের মেধা। নিয়মিত পাঠদানের পাশাপাশি সহশিক্ষা কার্যক্রম, সাংস্কৃতিক চর্চা ও ক্রীড়া কার্যক্রমে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য। এখান থেকে শিক্ষা নিয়ে বহু শিক্ষার্থী পরবর্তীতে প্রশাসন, শিক্ষা, রাজনীতি ও সমাজসেবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
তবে জাতীয় শিক্ষানীতির আলোকে আধুনিক পাঠক্রম, গবেষণাভিত্তিক শিক্ষা এবং দক্ষতা উন্নয়নমূলক কোর্স সংযোজনের প্রয়োজনীয়তা এখন সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে।
শিক্ষাবিদদের মতে, যথাযথ পরিকল্পনা ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে নড়াইল সরকারি ভিক্টোরিয়া কলেজ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একটি পূর্ণাঙ্গ উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা কেন্দ্রে রূপ নিতে পারে। নদীঘেঁষা পরিবেশ, ঐতিহাসিক ঐতিহ্য ও দীর্ঘ শিক্ষাধারা—সব মিলিয়ে এই কলেজের রয়েছে স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে তোলার সুযোগ।
ঐতিহ্যের ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে সময়োপযোগী আধুনিকায়নই পারে নড়াইল সরকারি ভিক্টোরিয়া কলেজকে আগামী দিনের প্রতিযোগিতামূলক শিক্ষাব্যবস্থায় আরও শক্ত অবস্থানে পৌঁছে দিতে—এমন প্রত্যাশাই সংশ্লিষ্টদের।














