সর্বশেষ:

kaliay kuashay thomke thaka jonopod

শৈত্যের চাদরে কালিয়া কুয়াশায় থমকে থাকা জনপদ, কাঁপুনির মধ্যে টিকে থাকার লড়াই

kaliay kuashay thomke thaka jonopod
Facebook
Twitter
LinkedIn

মোঃ মনিরুজ্জামান চৌধুরী কালিয়া (নড়াইল)

শীত এবার আর নীরবে আসেনি। হঠাৎ করেই জেঁকে বসেছে নড়াইলের কালিয়া উপজেলায়। মাঝারি ধরনের শৈত্য প্রবাহে কাঁপছে পুরো জনপদ। রাত ১২টায় পাশ্ববর্তী নিকটতম জেলা সদর গোপালগঞ্জে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৭ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বাতাসে আর্দ্রতা ছিল ৯৪ শতাংশ। এই অতিরিক্ত আর্দ্রতাই শীতকে আরও বেশি তীক্ষ্ণ করে তুলেছে। কনকনে ঠান্ডা আর ঘন কুয়াশার দাপটে বদলে গেছে জনজীবনের চেনা ছন্দ। ভোরের আগেই চারপাশ ঢেকে যায় কুয়াশার চাদরে। দূরের গাছপালা, রাস্তা, খাল-বিল—সবকিছু মিলিয়ে যায় ধূসর সাদা আবরণে। সকাল গড়ালেও সূর্যের দেখা মেলে দেরিতে। আলো আসতে না আসতেই ঠান্ডা বাতাস শরীরের ভেতর ঢুকে পড়ে। শহর হোক কিংবা গ্রাম—সবখানেই যেন এক ধরনের নীরবতা। মানুষের চলাচল কমে আসে, জীবনের গতি হয়ে পড়ে শ্লথ।

শীতের সবচেয়ে বড় ধাক্কা সামলাতে হচ্ছে খেটে খাওয়া মানুষদের। দিনমজুর, রিকশাচালক, ভ্যানচালক ও কৃষিশ্রমিকদের অনেকেই ভোরে কাজে বের হতে পারছেন না। কেউ কেউ বের হলেও কাজের গতি মন্থর হয়ে পড়ছে। ঠান্ডায় শরীর জমে আসছে। শহরের মোড়ে মোড়ে চায়ের দোকানে কিংবা গ্রামের খোলা জায়গায় খড়কুটো জ্বালিয়ে আগুন পোহাতে দেখা যায় মানুষকে। আগুনের চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা সেই মানুষগুলোর চোখেমুখে শুধু শীত নয়, ভেসে ওঠে জীবিকার অনিশ্চয়তা। প্রত্যন্ত অঞ্চল কালিয়ার নড়াগাতী থানার ইউনিয়ন গুলোতে শীতের প্রকোপ আরও গভীর। অনেক দরিদ্র পরিবারের ঘরে নেই পর্যাপ্ত শীতবস্ত্র। পুরোনো কম্বল, পাতলা চাদর কিংবা ছেঁড়া কাপড়েই কাটাতে হচ্ছে রাত। শিশুদের স্কুলে পাঠানো নিয়েও দুশ্চিন্তায় পড়েছেন অভিভাবকেরা। ভোরের কনকনে ঠান্ডায় অসুস্থ হয়ে পড়ছে ছোট শিশুরা। অনেক মা-বাবা বাধ্য হচ্ছেন সন্তানদের কয়েকদিন স্কুলে না পাঠাতে।

শীতের এই সময়ে সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে শিশু ও বয়স্করা। উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও স্থানীয় ক্লিনিকগুলোতে বাড়ছে রোগীর চাপ। সর্দি-কাশি, জ্বর, শ্বাসকষ্ট ও নিউমোনিয়াসহ ঠান্ডাজনিত নানা সমস্যায় আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিতে আসছেন মানুষ। চিকিৎসকদের মতে, এই সময়ে উষ্ণ পোশাক, গরম খাবার ও বাড়তি যত্ন জরুরি। কিন্তু বাস্তবতা হলো—সব পরিবারের পক্ষে তা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। কৃষকেরাও পড়েছেন দুশ্চিন্তায়। ঘন কুয়াশা ও শীতের কারণে মাঠের ফসল ক্ষতির আশঙ্কা বাড়ছে। বোরো ধান ও শীতকালীন সবজিতে রোগবালাইয়ের ঝুঁকিও দেখা দিয়েছে। তবুও ভোরের কুয়াশা ঠেলে মাঠে নামতে হচ্ছে তাঁদের। কারণ মাঠে না নামলে থেমে যাবে সংসারের চাকা। শীতের এই দাপটে কালিয়ার রাস্তাঘাটও যেন অন্যরকম। সকালে যানবাহনের চলাচল কমে যায়। কুয়াশার কারণে বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি। প্রয়োজন ছাড়া মানুষ ঘর থেকে বের হতে চাইছে না। সন্ধ্যা নামলেই আবার আগেভাগে নেমে আসে শীতের তীব্রতা।

আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, গোপালগঞ্জসহ আশপাশের অঞ্চলে মাঝারি ধরনের এই শৈত্য প্রবাহ আরও কয়েকদিন অব্যাহত থাকতে পারে। রাত ও ভোরে তাপমাত্রা আরও কমে যাওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। ফলে শীতের দাপট থেকে দ্রুত মুক্তির কোনো ইঙ্গিত নেই। শীতের এই দিনে কালিয়া যেন এক স্থিরচিত্র—কুয়াশায় ঢাকা রাস্তা, আগুন পোহানো মানুষ, কাঁপতে থাকা শিশুরা আর নিরুপায় চোখে তাকিয়ে থাকা বয়স্করা। তবুও জীবনের লড়াই থেমে নেই। আগুনের একটু উষ্ণতা, এক কাপ গরম চা আর মানুষের সহানুভূতিই হয়ে উঠেছে এই শীতে টিকে থাকার প্রধান ভরসা। শীত কেটে যাবে—এই আশাতেই কাঁপুনি নিয়েই এগিয়ে চলেছে কালিয়া।

Facebook
Twitter
LinkedIn

সর্বশেষ খবর

turan hossain rana