পাইকগাছা ( খুলনা) প্রতিনিধি
খুলনার পাইকগাছায় ভেলিডেশন ওয়ার্কশপ অনুষ্ঠিত হয়েছে। ২৫ মার্চ বুধবার দুপুরে পৌরসভার অডিটোরিয়ামে দাতা সংস্থা ওয়াটার এইড বাংলাদেশ এর সয়হতায় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা নবলোক পরিষদ এ কর্মশালার আয়োজন করে।উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ আহসানারা বিনতে আহমেদ এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কর্মশালায় প্রধান অতিথি ছিলেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার ওয়াসিউজ্জামান চৌধুরী। বিশেষ অতিথি ছিলেন উপজেলা প্রথমিক শিক্ষা অফিসার ( ভারপ্রাপ্ত ) সঞ্জয় দেবনাথ, উপজেলা প্রকৌশলী শাফিন শোয়েব। কর্মশালায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন নবলোক পরিষদের ওয়াশ সিস্টেমস ফর হেলথ প্রজেক্ট ম্যানেজার বি এম নাহিদ হাসান,প্রকল্পের পটভূমি, অর্জন ও কর্ম পরিকল্পনা উপস্থাপন করেন নবলোক পরিষদের মোহাাম্মাদ মাহবুবুল ইসলাম ভূঁইয়া, বক্তব্য রাখেন নবলোক পরিষদের প্রজেক্ট অফিসার কাজী ফারহানা আফরোজ, ওয়াটার এইড বাংলাদেশ এর টেকনিক্যাল অফিসার ফারাহ নাজনীন ,উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী প্রশান্ত পাল, পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা লালু সরদার, পৌরসভার প্রধান সহকারী জিয়াউর রহমান, বিলক্লার্ক শাহিন হোসেন, চাঁদখালী ইপি চেয়ারম্যান ভারপ্রাপ্ত আব্দুল্লাহ সরদার,ইউপি সচিব আব্বাস উদ্দীন, মিরাজুল ইসলাম, বিকাশ চন্দ্র ঘোষ, বীনা মন্ডল,সীমা দাশ, ইরানী খাতুন, শারমিন খাতুন, উত্তম ঘোষ,জুলেখা খাতুন,ফাতিমাতুজ জোহরা, সানজিদা নাহার সুমি,নবলোক পরিষদের প্রজেক্ট অফিসার ইঞ্জিনিয়ার সাজ্জাদ সরকার ও প্রজেক্ট অফিসার মুক্তা বিশ্বাস প্রমুখ।
উক্ত কর্মশালায় এসব বিষয়ে বিশদ আলোচনা হয় গত কয়েক দশকে বাংলাদেশ নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন সেবার প্রসারে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। জাতীয় পরিসংখ্যান অনুযায়ী, উন্নত পানির উৎসে প্রবেশাধিকার এখন ব্যাপকভাবে বিস্তৃত এবং উন্মুক্ত স্থানে মলত্যাগের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। বাংলাদেশ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (MICS) ২০১৯–২০২০ অনুযায়ী, প্রায় ৯৮ শতাংশ পরিবার উন্নত পানির উৎস ব্যবহার করে এবং প্রায় ৬৯ শতাংশ পরিবার উন্নত স্যানিটেশন সুবিধার আওতায় রয়েছে। উন্মুক্ত স্থানে মলত্যাগের হার ১ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে—যা গত দুই দশকের ধারাবাহিক অগ্রগতির প্রতিফলন। এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে সরকারি বিনিয়োগ, শক্তিশালী নেতৃত্ব এবং উন্নয়ন সহযোগী ও নাগরিক সমাজের সক্রিয় ভূমিকা।
বাংলাদেশে ওয়াশ ব্যবস্থা একটি বিকেন্দ্রীভূত কাঠামোর মাধ্যমে পরিচালিত হয়, যেখানে জাতীয় মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান (LGI) এবং বিশেষায়িত কারিগরি সংস্থাগুলো যৌথভাবে কাজ করে। স্থানীয় সরকার বিভাগ (LGD) নীতি নির্ধারণ ও তদারকির দায়িত্ব পালন করে। বাস্তবায়ন পর্যায়ে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর (DPHE) পানি ও স্যানিটেশন অবকাঠামো পরিকল্পনা, নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে কারিগরি সহায়তা প্রদান করে।
গ্রামীণ এলাকায় ইউনিয়ন পরিষদ এবং শহরাঞ্চলে পৌরসভা স্থানীয় পর্যায়ে সেবা প্রদান ও তদারকির দায়িত্বে থাকে। তারা পানি সরবরাহ, স্যানিটেশন ব্যবস্থা, ড্রেনেজ এবং কমিউনিটি সম্পৃক্ততার কাজ পরিচালনা করে। এছাড়া, বিভিন্ন প্রশাসনিক স্তরে ওয়াটসান (WATSAN) কমিটি বিভিন্ন কাজে সমন্বয়, পরিকল্পনা ও তথ্য আদান-প্রদানে সহায়তা করে। তবে বাস্তবে এসব কাঠামোর কার্যকারিতা অঞ্চলভেদে ভিন্ন হয়—যা প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও সম্পদের ওপর নির্ভরশীল।
অবকাঠামোগত উন্নয়ন সত্ত্বেও ওয়াশ সেবার পর্যবেক্ষণ ও প্রতিবেদন ব্যবস্থা এখনও স্থানীয় পর্যায়ে বিচ্ছিন্ন ও দুর্বল। ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, DPHE এবং উন্নয়ন সংস্থার মধ্যে দায়িত্ব বিভাজন থাকায় অনেক ক্ষেত্রে সমন্বয়ের ঘাটতি, তথ্য সংগ্রহের দুর্বলতা এবং জবাবদিহিতার সীমাবদ্ধতা দেখা যায়।
বর্তমান ব্যবস্থায় ওয়াশের বিভিন্ন সমস্যা শনাক্তকরণ অনেকটাই প্রতিক্রিয়াশীল। যেমন—নলকূপ নষ্ট হওয়া, ড্রেনেজ বন্ধ হয়ে যাওয়া বা স্যানিটেশন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার মতো সমস্যাগুলো সাধারণত তখনই জানা যায়, যখন ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেন। কিন্তু অভিযোগ জানানোর নির্দিষ্ট ও সহজলভ্য পদ্ধতি সব জায়গায় নেই। ফলে অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগ অনানুষ্ঠানিকভাবে ব্যক্তিগত যোগাযোগ বা স্থানীয় প্রতিনিধিদের মাধ্যমে জানানো হয়।
কিছু পৌরসভায় ‘ইন্টিগ্রেটেড মিউনিসিপাল ইনফরমেশন সিস্টেম’ (IMIS) চালু থাকলেও এটি মূলত প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার জন্য ব্যবহৃত হয় এবং স্থানীয় মানুষদের সাথে যোগাযোগ তৈরির কোন উপায় এখানে নেই। ফলে মাঠ পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নীতিনির্ধারণে প্রতিফলিত হয় না। এছাড়া অভিযোগ ট্র্যাকিংয়ের সীমাবদ্ধতা, ওয়াটসান কমিটির অনিয়মিত কার্যক্রম এবং অভিযোগ জানানোর অসুবিধার কারণে স্বচ্ছতা ও জনআস্থা কমে যায়।
কমিউনিটি মনিটরিং ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা
পানি ও স্যানিটেশন খাতে সেবার মান উন্নয়নে কমিউনিটির অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কমিউনিটি-ভিত্তিক মনিটরিং ব্যবস্থা মানুষের জন্য একটি কাঠামোবদ্ধ এবং সংঘবদ্ধ প্ল্যাটফর্ম হতে পারে, যার মাধ্যমে তারা সমস্যা জানাতে, সেবার মান পর্যবেক্ষণ করতে এবং কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে পারে।
এ ধরনের ব্যবস্থা চালু হলে স্থানীয় সরকার দ্রুত সমস্যা শনাক্ত করতে পারে এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে সক্ষম হবে। একইসঙ্গে এটি পরিকল্পনা ও রক্ষণাবেক্ষণে তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করবে। কমিউনিটি যদি তাদের অভিযোগের প্রতিকার পায়, তাহলে প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আস্থা যেমন বাড়ে, বিপরীতে, কার্যকর ব্যবস্থা না থাকলে মানুষ হতাশ হয়ে অনানুষ্ঠানিক পদ্ধতির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।