আলাউদ্দিন সোহাগ,পাইকগাছা ( খুলনা ) থেকে।।
চারিদিকে রবি শস্যের ছড়াছড়ি, ঘরে তোলার মতো হয়েছে সরিষা, এ পাশে ওপাশে গমের ক্ষেত, কেউ কেউ রোপণ করেছে বোরো ধানের চারা। মাঝে ফাগুনের বাতাসে দুলছে সবুজ বার্লির শীষ। এ যেন এক অপরুপ প্রাকৃতিক দৃশ্য। দেখতে অনেকটাই গমের মতো হলেও এর আগে কেউ পরিচিত নয় নতুন এ রবি শস্যের সাথে। সবার কাছে বার্লি নতুন ফসল, নতুন এক সম্ভাবনা। ভালো ফলন এবং বার্লির অপরুপ সবুজ সৌন্দর্য মুগ্ধ করছে সবাই কে। শুধু আশেপাশের নয় দুর দুরন্ত থেকে কৃষক সহ অসংখ্য মানুষ প্রতিদিন দেখতে আসছে কৃষক মনিরুল ইসলামের বার্লির ক্ষেত। কৃষক মনিরুল খুলনার পাইকগাছা উপজেলার কাজীমুছা গ্রামের আয়ুব আলী বিশ্বাসের ছেলে। রামচন্দ্র নগর মৌজায় প্রায় ১ বিঘা জমিতে প্রথম বারের মতো চাষ করেছেন বারি বার্লি - ৭ ও বারি বার্লি - ১০। প্রথম বারেই লবনাক্ত জমিতে বার্লি চাষে চমক সৃষ্টি করেছেন কৃষক মনিরুল। তার এই সাফল্যে উপকূলীয় কৃষিতে নতুনভাবে যুক্ত হতে যাচ্ছে বার্লি। বার্লি কে উপকূলীয় কৃষির নতুন সম্ভাবনা হিসেবে দেখছেন কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর।
বার্লি মূলত পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ একটি রবি শস্য। মাল্ট তৈরি ও পশু খাদ্য হিসেবে বার্লির প্রচুর চাহিদা রয়েছে। বাংলাদেশে বার্লির অভ্যন্তরীণ উৎপাদন চাহিদা অনুযায়ী অপর্যাপ্ত হওয়ায় ঘাটতি মেটাতে অস্ট্রেলিয়া, রাশিয়া, ইউক্রেন এবং কানাডা থেকে আমদানি করা হয়। বার্লি আমদানিতে সরকার কে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতে হয়। দেশের অন্যান্য স্থানে কমবেশি বার্লির চাষ হলেও উপকূলীয় অঞ্চলে এটি একটি অপরিচিত নতুন ফসল। বার্লির সাথে এখনো এখানকার কৃষকরা পরিচিত হয়ে ওঠেনি। বার্লির চাষ সম্পর্কে নেই তেমন কোন ধারণা। তবে বসে নেই কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট এর বিজ্ঞানী, কৃষি বিভাগ কিংবা কৃষকরা। প্রতিনিয়ত বদলে যাচ্ছে প্রচলিত উপকূলীয় কৃষি। কৃষিতে যুক্ত হচ্ছে নানা উদ্ভাবনী এবং লবণ সহিষ্ণু উদ্ভাবিত ফসলের বিভিন্ন উন্নত জাত। উপকূলীয় কৃষিতে নতুন করে যুক্ত হচ্ছে পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ রবি শস্য বার্লি। কৃষকদের মাধ্যমে পরীক্ষামূলক চাষ শুরু করেছেন বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট এর গবেষকরা। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, সরেজমিন গবেষণা বিভাগ খুলনার মাধ্যমে প্রথম বারেই লবনাক্ত জমিতে বার্লি চাষ করে উপকূলীয় কৃষিতে একজন সফল কৃষক হিসেবে জায়গা করে নিয়েছেন। উপকূলীয় কৃষির জন্য সৃষ্টি করেছেন নতুন এক সম্ভাবনা। কৃষক মনিরুল ইসলাম বলেন এর আগে এই জমিতে রবি ফসল হিসেবে গম এবং বোরোধানের চাষ করতাম। কৃষি গবেষণা বিভাগের গবেষকদের পরামর্শে প্রথম বারের মতো বার্লি চাষ করেছি।
কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট আমাকে বীজ সার সহ অন্যান্য উপকরণ দিয়ে সহযোগিতা করেছে। ফলন কেমন হবে এনিয়ে শুরুতেই একটু চিন্তা হতো। তবে এখন ভালো ফলন দেখে খুব ভালো লাগছে। দূর দূরন্ত এবং আশেপাশের কৃষক ও অন্যান্য লোকজন যখন আমার ক্ষেত দেখতে আসে তখন মনটা খুশিতে ভরে যায়। সরেজমিন কৃষি গবেষণা বিভাগ খুলনার বৈজ্ঞানিক সহকারী মোঃ জাহিদ হাসান বলেন বারি বার্লি -৭ ও বারি বার্লি -১০ দুটি জাতই লবণ সহিষ্ণু এবং উপকূলীয় অঞ্চলে চাষের জন্য উপযোগী। তিনি বলেন গম এবং বার্লির উৎপাদন প্রায় সমান হলেও গমের চেয়ে বার্লির উৎপাদন খরচ অনেক কম। এছাড়া গমের চেয়ে বার্লি অনেক বেশি পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ। বাজারে চাহিদা এবং দাম ও বেশি। এজন্য বার্লি একটি লাভজনক ফসল। এর আগে কয়রায় পরীক্ষামূলক চাষ হয়েছে তবে পাইকগাছায় কৃষক মনিরুল ইসলাম প্রথম চাষ করেছে। এখন মিল্ক পর্যায়ে রয়েছে। বারি বার্লি -৭ এর চেয়ে বারি বার্লি -১০ তুলনামূলক একটু বেশি লম্বা ও উচু হয়েছে। আগামী ২০ দিন পর বার্লি উত্তোলন করা যাবে। বারি- ৭ হেক্টর প্রতি আড়াই মেট্রিক টন এবং বারি-১০ হেক্টর প্রতি ৩ মেট্রিক টন উৎপাদন হতে পারে এমনটাই জানান জাহিদ হাসান। উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ একরামুল হোসেন বলেন বার্লি চাষ এই এলাকায় এটাই প্রথম।
এটি কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট সম্পূর্ণ তদারকি করছে। তবে উপকূলীয় কৃষিতে বার্লি সংযোজন হলে সম্ভাবনায় নতুন মাত্রা যুক্ত হবে। বার্লি চাষ সম্প্রসারিত হলে আমদানি নির্ভরতা কমে আসবে, এতে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে এবং পুষ্টি চাহিদা ও পশু খাদ্য হিসেবে বার্লির ব্যবহার বাড়বে বলে জানান উপজেলা নির্বাহী অফিসার ওয়াসিউজ্জামান চৌধুরী। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট সরেজমিন গবেষণা বিভাগ খুলনার প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মোঃ কামরুল ইসলাম বলেন দেশে বার্লির স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে পরীক্ষামূলক চাষে যে সফলতা ও সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। মাঠ পর্যায়ে সম্প্রসারিত হলে বার্লির উৎপাদন এবং এর ব্যবহার বাড়বে বলে আশা করছি। উপকূলীয় কৃষিকে টেকসই ও সমৃদ্ধ করতে ভবিষ্যতে বার্লি চাষ সম্প্রসারণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এমনটাই প্রত্যাশা সকলের।