
আলাউদ্দিন সোহাগ,পাইকগাছা (খুলনা) থেকে।।
খুলনার পাইকগাছা উপজেলায় হামের সংক্রমণ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। সাম্প্রতিক সময়ে রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সম্ভাব্য প্রাদুর্ভাবের আশঙ্কা প্রকাশ করে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। বিশেষ করে শিশুদের জন্য এই রোগ মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় স্বাস্থ্য বিভাগ সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর জোর দিচ্ছে।গত এক সপ্তাহে পাইকগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে হামের লক্ষণ নিয়ে ৭ জন রোগী চিকিৎসা নিতে এসেছেন। এতে স্থানীয়ভাবে সংক্রমণের প্রবণতা বাড়ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, দ্রুত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা গেছে, গত মার্চ মাসে সন্দেহভাজন হিসেবে ৫ জন রোগী পাওয়া যায়। ৩ জনের নমুনা ঢাকায় পাঠানো হলে ৩ জনের পরীক্ষার রিপোর্ট নেগেটিভ এলেও পরে আবার বাকি ২ জনের নমুনা ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। সেই রিপোর্ট পাওয়ার পর নিশ্চিত হওয়া যাবে তারা হামে আক্রান্ত কিনা।
এদিকে এপ্রিল মাসের ১ তারিখে নতুন করে আরও ৩ জন রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। তাদের মধ্যে ২ জন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে চলে যান। একজনের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার্ড করা হয়েছে। এছাড়া আউটডোরে আরও একজন রোগী এলেও তাকে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হলেও তিনি ভর্তি না হয়ে চলে যান। আক্রান্তদের মধ্যে পাইকগাছা পৌর সদর, পুরাইকাটি, হেতামপুর ও লস্কর এলাকার বাসিন্দারা রয়েছেন।পাইকগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক ডা. শাকিলা আফরোজ বলেন,“হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। সাধারণত জ্বর, কাশি, চোখ লাল হওয়া এবং পরে সারা শরীরে র্যাশ দেখা দেয়। অনেক ক্ষেত্রে এটি মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে, বিশেষ করে শিশুদের জন্য।”
তিনি আরও বলেন,“রোগী বুঝে ওঠার আগেই অন্যদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই আক্রান্ত ব্যক্তিকে দ্রুত আলাদা রাখা, মাস্ক ব্যবহার করা, ঘন ঘন হাত ধোয়া এবং চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া অত্যন্ত জরুরি।”উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আহসানারা বিনতে আহমেদ বলেন,“হাম প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো টিকাদান। প্রতিটি শিশুকে নির্ধারিত সময়ে হামের দুই ডোজ টিকা দিতে হবে, এতে প্রায় ৯৯ শতাংশ সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব।”
তিনি আরও জানান,“অভিভাবকদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কেউ যেন টিকা নিতে অবহেলা না করেন—এ বিষয়ে আমরা নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছি। এমন লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত স্বাস্থ্যকর্মীর সঙ্গে যোগাযোগ করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি পাইকগাছায় হামের জন্য একটি বিশেষ চিকিৎসা কর্নার চালু করা হয়েছে।”স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম একটি মারাত্মক সংক্রামক রোগ, যা বিশ্বব্যাপী প্রতিদিন বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটায়—যার অধিকাংশই পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু। এই রোগ থেকে সুস্থ হলেও অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্য জটিলতা দেখা দিতে পারে।
হামের জটিলতার মধ্যে নিউমোনিয়া, তীব্র ডায়রিয়া, অন্ধত্ব এবং মস্তিষ্কে প্রদাহ (এনসেফালাইটিস) অন্যতম। এছাড়া এটি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দীর্ঘ সময়ের জন্য দুর্বল করে দেয়, ফলে অন্যান্য সংক্রমণের ঝুঁকিও বেড়ে যায়।
বিশেষজ্ঞরা জানান, হাম অত্যন্ত ছোঁয়াচে। আক্রান্ত ব্যক্তি কাশি বা হাঁচির মাধ্যমে ভাইরাস ছড়িয়ে দেয়, যা বাতাসে প্রায় ২ ঘণ্টা পর্যন্ত সক্রিয় থাকতে পারে। এমনকি র্যাশ দেখা দেওয়ার আগেই সংক্রমণ ছড়াতে শুরু করে।বর্তমান পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য বিভাগ সাধারণ মানুষের প্রতি কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—শিশুদের নির্ধারিত সময়ে টিকা প্রদান, আক্রান্ত ব্যক্তিকে আলাদা রাখা, কাশি-হাঁচির সময় মুখ ঢেকে রাখা, নিয়মিত হাত ধোয়া এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা।















