মোঃ মনিরুজ্জামান চৌধুরী
নড়াইল প্রতিনিধি :
নড়াইল জেলার কালিয়া উপজেলার নড়াগাতী থানাধীন বিস্তীর্ণ জনপদ আজ এক অদৃশ্য সংকটে জর্জরিত। আধুনিক যুগে যেখানে জ্বালানি একটি মৌলিক প্রয়োজন হিসেবে বিবেচিত, সেখানে শুধুমাত্র একটি পেট্রোল পাম্প না থাকার কারণে এই অঞ্চলের হাজার হাজার মানুষ প্রতিনিয়ত চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। যেন তাদের এই কষ্ট দেখার কেউ নেই, শোনারও কেউ নেই।
কলাবাড়িয়া, মাউলী, জয়নগর, খাশিয়াল, বাঐশোনা ও পহরডাঙ্গা—এই ছয়টি ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ জনপদজুড়ে একই চিত্র। কর্মজীবী মানুষ, কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী—সবাই জ্বালানি সংকটের নির্মম বাস্তবতায় অসহায় হয়ে পড়েছেন। নড়াগাতী এলাকায় একটি পেট্রোল পাম্প না থাকায় স্থানীয়দের একমাত্র ভরসা এখন খোলা বাজার, যেখানে তেলের সরবরাহ অপ্রতুল এবং মূল্যও অস্থির।
ভুক্তভোগীরা জানান, প্রয়োজনের তাগিদে অনেকেই পার্শ্ববর্তী কালিয়া উপজেলা কিংবা গোপালগঞ্জ জেলায় ছুটে যাচ্ছেন। কিন্তু সেখানেও স্বস্তি নেই। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে মাথাপিছু সামান্য পরিমাণ তেল সংগ্রহ করতে হয়। তাও আবার নানা বৈষম্য ও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। অনেক সময় যাতায়াত খরচেই সেই তেলের বড় অংশ শেষ হয়ে যায়। ফলে তেল সংগ্রহ যেন আরেকটি দুর্ভোগের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মূলশ্রী গ্রামের ঠান্ডু শেখ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা কি এই দেশের নাগরিক নই? একটি পেট্রোল পাম্পের জন্য আমাদের এভাবে ভোগান্তি পোহাতে হবে কেন? তেল আনতে গিয়ে যে খরচ হয়, তাতে লাভের চেয়ে ক্ষতিই বেশি।”
সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা। সেচ কার্যক্রম, জমি চাষ, ধান মাড়াইসহ কৃষির নানা কাজে জ্বালানি অপরিহার্য। কিন্তু তেলের অভাবে অনেকেই সময়মতো সেচ দিতে পারছেন না, জমি প্রস্তুত করতে পারছেন না। এতে ফসল উৎপাদনে মারাত্মক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। কৃষকের চোখে এখন অনিশ্চয়তার ছায়া, বুকভরা হতাশা।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও ক্ষতির মুখে পড়েছেন। পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় পণ্য সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে, যার প্রভাব পড়ছে বাজারদরেও। ধীরে ধীরে পুরো এলাকার অর্থনৈতিক কার্যক্রমে স্থবিরতা নেমে আসছে।
এমনকি জরুরি সেবাখাতও এ সংকট থেকে মুক্ত নয়। রোগী পরিবহন, অ্যাম্বুলেন্স সেবা, এমনকি নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজে ব্যবহৃত মোটরযান চালানোও হয়ে পড়েছে কঠিন। প্রতিদিনের জীবনযাত্রা যেন থমকে দাঁড়িয়েছে।
দেশব্যাপী জ্বালানি পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সরকার যেখানে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করছে, সেখানে নড়াগাতীর মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলের এই চরম সংকট যেন অদেখাই থেকে যাচ্ছে—এমনটাই মনে করছেন স্থানীয়রা।
তাদের দাবি, অবিলম্বে নড়াগাতী এলাকায় একটি পেট্রোল পাম্প স্থাপন করা হোক। এতে শুধু ভোগান্তিই কমবে না, বরং এই অঞ্চলের অর্থনীতি ও কৃষিখাত নতুন করে প্রাণ ফিরে পাবে।
নড়াগাতীবাসীর আকুতি—“আমাদের এই দুর্ভোগের শেষ কোথায়? আমরা কি আর কতদিন এমন কষ্ট সহ্য করবো?”
এমন প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা। তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত হস্তক্ষেপই পারে এই দীর্ঘদিনের বঞ্চনার অবসান ঘটাতে।