আবু হানিফ,বাগেরহাট প্রতিনিধিঃ
হাইকোর্ট জামিন দিয়েছেন। কিন্তু জুয়েল হাসান সাদ্দাম এখনও কারাগারের ভেতরেই।স্ত্রী আর সন্তানের মৃত্যুর তিন দিন পর পাওয়া সেই জামিনের আদেশের কপি এখনো পৌঁছায়নি কারাগারে। কাগজের দেরিতে থমকে আছে একজন মানুষের শেষ আশা যার জীবনে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।
পরিবারের একজন বললেন, ১০ মাস পর সব মামলায় জামিন পেলেও কী হবে? ভাই বের হলে তো আর তার স্ত্রী আর একমাত্র সন্তানকে জীবিত পাবে না।কারাগারের দেয়ালের ভেতর থাকা সাদ্দামের জীবনে গত নয় মাস ছিল শুধুই অপেক্ষা।এই সময়ের মধ্যেই তার স্ত্রী কানিজ সুবর্ণা স্বর্ণালী জন্ম দেন এক ছেলে সন্তানের তার নাম সেজাদ হাসান নাজিফ। কিন্তু বাবা হিসেবে সন্তানের মুখে একবারও চুমু দেওয়া হয়নি সাদ্দামের।কোলে নেওয়ার সুযোগও হয়নি একবারের জন্য।
এক মামলায় জামিন মিললেই আরেক মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হতো। কারাগার আর কাগজের ফাঁদে আটকে ছিল তার জীবন।এরই মধ্যে হতাশার চূড়ান্ত পরিণতি ঘটে বাইরে।স্বামী বন্দি,প্যারোল ঝুলে আছে, এই অসহনীয় বাস্তবতায়। শুক্রবার দুপুরে বাগেরহাটের সাবেকডাঙ্গা গ্রামের বাড়িতে স্বর্ণালী প্রথমে বালতির পানিতে চুবিয়ে হত্যা করেন নিজের নয় মাসের শিশুকে। তারপর সেই ঘরেই গলায় রশি দিয়ে শেষ করে দেন নিজের জীবন।
যে ঘরটিতে নতুন জীবনের হাসি থাকার কথা ছিল, সেখানেই নেমে আসে নিস্তব্ধতা।স্ত্রী-সন্তানের মৃত্যুর পরও প্যারোল মুক্তি মেলেনি সাদ্দামের।শনিবার রাতে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের ফটকে লাশবাহী গাড়ির ভেতর থেকে তাকে দেখানো হয় তার স্ত্রী আর শিশুসন্তানের মরদেহ শেষবারের মতো।একজন ভাই,একজন বাবা কফিনের ভেতর শুয়ে থাকা মানুষ দু’জনকে দেখেই আবার ফিরে যেতে হয় কারাগারে।এর চেয়ে বড় শাস্তি আর কী হতে পারে?
এই ঘটনায় দেশ-বিদেশে সমালোচনার ঝড় ওঠে। মানবিক প্রশ্ন উঠে এতটুকু সুযোগ কি দেওয়া যেত না?শেষ পর্যন্ত সোমবার হাইকোর্ট মানবিক বিবেচনায় ছয় মাসের জামিন দেন। কিন্তু মঙ্গলবার বিকেল পর্যন্তও সেই আদেশের কপি পৌঁছায়নি কারাগারে।সাদ্দামের ছোট ভাই শহিদুল ইসলাম বলেন,ভাই বের হলে শুধু কবরই দেখবে। আর কিছু নেই। সে তো তার সন্তানকে একবারও কোলে নিতে পারেনি। যশোর কারাগারের গেটে দাঁড়িয়ে মৃত স্ত্রী আর সন্তানের লাশ দেখা এর চেয়ে কষ্টের আর কী হতে পারে?”
এই শোক সইতে না পেরে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন তাদের মা দেলোয়ারা বেগম। এদিকে সাবেক এমপি এম এ এইচ সেলিম সাদ্দামের স্ত্রী ও সন্তানের কবর জিয়ারত করে বলেন,এই দুটি মৃত্যু সবার হৃদয়কে নাড়া দিয়েছে।পরিবার বলছে এটি হত্যাকাণ্ড।সঠিক তদন্ত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।কারা কর্তৃপক্ষ জানায়, জামিনের কপি পেলেই দ্রুত যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হবে।কিন্তু ততক্ষণে প্রশ্নটা থেকেই যায়,যে মানুষটি তার সবকিছু হারিয়েছে, তার কাছে এই বিলম্বের মূল্য কতটা নিষ্ঠুর?