তুরান হোসেন রানাঃ
গাঁজা সেবনের ঘটনা দেখে ফেলেছিল ১৩ বছরের এক মাদ্রাসা ছাত্র। সেই “অপরাধেই” তাকে নির্মমভাবে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়। এরপর নিজের অপরাধ আড়াল করতে মরদেহে আগুন ধরিয়ে জঙ্গলের ভেতর ফেলে রেখে পালিয়ে যায় ঘাতক। গাজীপুরের জয়দেবপুরে ঘটে যাওয়া এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তথ্যপ্রযুক্তি, সিসিটিভি ফুটেজ ও গোয়েন্দা তৎপরতার সমন্বয়ে ঘটনার সঙ্গে জড়িত এক যুবককে গ্রেফতার করা হয়েছে। ইতোমধ্যে সে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছে।
নিহত মাহাবুব ইসলাম রনি (১৩) জয়দেবপুর থানাধীন ভবানীপুর পূর্বপাড়া এলাকার খুরশিদিয়া মারকাজুল উলুম কওমী মাদ্রাসা ও এতিম খানার নাজেরা বিভাগের ছাত্র ছিল। গত ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখ রাত আনুমানিক ৯টার দিকে সে ভবানীপুর পূর্বপাড়া দারুস সালাম জামে মসজিদে তারাবির নামাজ আদায় শেষে বাসার উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। কিন্তু সেই যাত্রাই হয়ে ওঠে তার জীবনের শেষ পথচলা।
পরদিন ২৮ ফেব্রুয়ারি বেলা আনুমানিক ১১টার দিকে ভবানীপুর পূর্বপাড়ার বাসিন্দা মো. মোশারফ হোসেনের ফলজ ও বনজ গাছের বাগানের জঙ্গলের ভেতর আগুনে পোড়া অবস্থায় তার মরদেহ পড়ে থাকতে দেখা যায়। ঘটনাটি মুহূর্তেই এলাকায় তীব্র চাঞ্চল্য ও আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়। স্থানীয়রা একে ‘নির্মম ও নৃশংস হত্যাকাণ্ড’ বলে আখ্যা দেন।
ঘটনার পর ভিকটিমের দাদা বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে জয়দেবপুর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলাটি পরবর্তীতে পিবিআইয়ের সিডিউল ভুক্ত হলে পিবিআই গাজীপুর জেলা ইউনিট স্বপ্রণোদিত হয়ে তদন্তভার গ্রহণ করে। মামলাটি তদন্ত করছেন এসআই বিশ্বজিত বিশ্বাস, বিপিএম-সেবা।তদন্তের শুরু থেকেই ঘটনাটিকে গুরুত্বের সঙ্গে নেয় পিবিআই। তথ্যপ্রযুক্তি বিশ্লেষণ, ঘটনাস্থলের পারিপার্শ্বিকতা, স্থানীয় সোর্সের তথ্য সংগ্রহ এবং আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখে তদন্তকারীরা ধীরে ধীরে ঘটনার জট খুলতে শুরু করেন। এক পর্যায়ে সন্দেহের তীর গিয়ে পড়ে ভবানীপুর এলাকার যুবক ছাব্বির আহম্মেদ (১৯)-এর দিকে। অবশেষে গত ৫ মার্চ তাকে গ্রেফতার করা হয়।
গ্রেফতারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদেই ভেঙে পড়ে ছাব্বির। পরে আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে সে হত্যাকাণ্ডের লোমহর্ষক বর্ণনা দেয়।পিবিআই সুত্রে জানা যায়, ঘটনার দিন রাত আনুমানিক ৯টার দিকে ছাব্বির জঙ্গলের ভেতরে বসে গাঁজা সেবন করছিল। ঠিক সেই সময় মাদ্রাসা ছাত্র রনি সেখানে গিয়ে তাকে দেখে ফেলে। বিষয়টি অন্যদের জানিয়ে দেওয়ার কথা বলতেই আতঙ্কিত হয়ে পড়ে ছাব্বির। নিজের অপকর্ম ফাঁস হয়ে যাওয়ার ভয়ে ক্ষিপ্ত হয়ে সে রনিকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয় এবং গলায় চাপ দিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। এরপর অপরাধের চিহ্ন মুছে ফেলতে মরদেহে আগুন ধরিয়ে জঙ্গলের ভেতর ফেলে রেখে পালিয়ে যায়।
মাত্র ১৩ বছরের এক নিরীহ মাদ্রাসা ছাত্রকে এভাবে নির্মমভাবে হত্যা এবং পরে মরদেহ পুড়িয়ে প্রমাণ নষ্টের চেষ্টা স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। তবে দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রযুক্তি নির্ভর তদন্তের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন এবং আসামিকে গ্রেফতার করায় পিবিআইয়ের ভূমিকা প্রশংসিত হচ্ছে।পিবিআই জানিয়েছে, এ হত্যাকাণ্ডে অন্য কেউ জড়িত রয়েছে কি না তা গুরুত্ব সহকারে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। মামলার তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।