আবু-হানিফ,বাগেরহাট প্রতিনিধিঃ
বাগেরহাটে ‘সাদা সোনা’ খ্যাত বাগদা চিংড়ি উৎপাদন হুমকির মুখে পড়েছে।
বছরের পর বছর ধরে ভাইরাস, সাদা স্পটসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে ঘেরের
মাছ মারা যাচ্ছে। এতে দেশের অন্যতম রপ্তানিযোগ্য বাগদা চিংড়ি উৎপাদন
হুমকির মুখে পড়েছে।
বাংলাদেশে রপ্তানি খাতের বড় একটি অংশ গড়ে উঠেছে বাগদা চিংড়িকে ঘিরে।
দেশের মোট বাগদা উৎপাদনের সিংহভাগই আসে বাগেরহাট জেলা থেকে। জেলায় প্রায়
৫৫ হাজার হেক্টর জমিতে প্রায় ৫৭ হাজার চাষি এ খাতের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু
ধারাবাহিক রোগবালাই ও উৎপাদন হ্রাসের কারণে চিংড়ি চাষ এখন চাষিদের জন্য
লাভের বদলে ক্ষতির খাতায় নাম লিখছে।
চাষিদের অভিযোগ, মানসম্মত পোনা সহজলভ্য নয়। বাজারে যেসব খাবার পাওয়া যায়
তাতে প্রোটিনের পরিমাণ যথেষ্ট কম, ফলে চিংড়ির বৃদ্ধি ব্যাহত হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চিংড়ির খাবারে অন্তত ৩০ শতাংশ প্রোটিন থাকা উচিত।
কিন্তু বাস্তবে বাজারে পাওয়া খাবারে থাকে মাত্র ১৬ থেকে ১৮ শতাংশ। এতে
করে ঘেরে মাছের কাঙ্ক্ষিত বৃদ্ধি হয় না। ফলে উৎপাদন কমে যাচ্ছে, বাজারে
যোগানেও প্রভাব পড়ছে।
বাগেরহাট সদর ডেমার ইউনিয়নের মৎস চাষি নাজমুল তরফদার বলেন, কখনো লাভ
করেছি, আবার অনেকবার ক্ষতিও গুনেছি। এ বছর মৌসুমের শুরুতে ঘেরের মাছ
ভালোই ছিল। কিন্তু কয়েক দফায় মাছ মারা গেল। কিছু মাছের গায়ে সাদা দাগ
দেখা যায়, কিছু আবার পানিতেই মারা গিয়ে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। এভাবে চললে আর
চাষ করা সম্ভব নয়।
রামপাল উপজেলার আলকাছ হাওলাদার জানান, পোনা ছাড়ার এক মাস পর তার ঘেরে মাছ
বড় হচ্ছিল। কিন্তু হঠাৎ জাল ফেলতেই দেখা যায়, মাছ দুর্বল হয়ে মারা
যাচ্ছে। কয়েক দিনের মধ্যে পুরো ঘেরের মাছ মরে যায়। এই মৌসুমে তিনবার মাছ
মরেছে। এখন আমি দেনায় জর্জরিত। আশেপাশের আরো অনেক প্রান্তিক চাষি একই
সমস্যায় পড়েছেন বলেন তিনি।
ফকিরহাট উপজেলার চাষী শফিকুর রহমান বলেন, মৎস্য বিভাগের পরামর্শ অনুযায়ী
ঘের পরিচর্যা করলেও শেষ রক্ষা হয়নি। প্রচণ্ড রোদে ঘের শুকিয়ে যাওয়ার পর
হঠাৎ বৃষ্টি হলে মাছ মারা যায়। কখনো মাছ ভেসে উঠে, কখনো ঘাসের ওপর চলে
আসে। চারটি ঘেরে জাল ফেলেছিলাম, সেখানে মাত্র ৫ কেজি বাগদা পেয়েছি।
জেলা চিংড়ি চাষি সমিতির সভাপতি ফকির মহিতুল ইলাম সুমন বলেন, প্রতি বছরই
ভাইরাস ও সাদা স্পট রোগ দেখা দেয়। তবে এ বছর নতুন ধরনের রোগ হয়েছে, এতে
মাছ স্পঞ্জের মতো হয়ে যাচ্ছে। অনেক মাছ বড় হওয়ার আগেই মরে যাচ্ছে। এভাবে
চলতে থাকলে আগামী বছর আরো বড় সংকট তৈরি হবে। আমরা চাই, মৎস্য বিভাগ ও
গবেষণা কেন্দ্র কার্যকর উদ্যোগ প্রহন করা হোক।
চিংড়ি গবেষণা কেন্দ্রের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. এএসএম তানবিরুল
হক বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এ সমস্যা বাড়ছে। হঠাৎ তাপমাত্রা
ওঠানামা করলে চিংড়ি মারা যায়। এজন্য ঘেরের গভীরতা বাড়াতে হবে এবং ঘের
পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। গরু-ছাগল বা অন্য প্রাণী যাতে ঘেরে ঢুকতে
না পারে সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে।
এ বিষয়ে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ড. আবুল কালাম আজাদ বলেন, চিংড়ি চাষে
বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ না করায় অনেক সময় ক্ষতি হয়। মানসম্মত পোনা
ব্যবহার ও খাবারের সঠিক মান নিশ্চিত করতে হবে। আমরা চাষিদের নিয়মিত
পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছি।